১৯৮৫ সালের জরিপ এখনও ঝুলন্ত, ডিজিটাল জরিপের অভাবে ভোগান্তিতে লাখো জমির মালিক
বগুড়া অঞ্চলের (বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলা) ভূমি জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। দীর্ঘ ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শুরু হওয়া আরএস জরিপের ভুল-ত্রুটি ও অভিযোগ সংশোধনের জটিলতা কাটেনি। এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ কার্যক্রম এগিয়ে চললেও বগুড়া অঞ্চলে তা শুরু না হওয়াুয় আধুনিক ভূমিসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লাখো জমির মালিক। জরিপের ভুল রেকর্ড নিয়ে ভোগান্তির পাশাপাশি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বাড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে বগুড়া অঞ্চলে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ শুরু হয়। জরিপে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের দিয়ে কাজ করানো হলেও যথাযথ তদারকির অভাবে ব্যাপক অনিয়ম ও ভুল রেকর্ড তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই ভুল সংশোধনেই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে সেটেলমেন্ট কার্যালয়কে।
জরিপের ভুলের মধ্যে রয়েছে নকশার সঙ্গে পর্চার অমিল, দাগ নম্বরে ভুল এবং এক ব্যক্তির জমি অন্য ব্যক্তির নামে রেকর্ড হওয়া। এসব ভুলের কারণে জমির মালিকদের পড়তে হচ্ছে নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায়।
মালগ্রাম মৌজায় ৬০ দাগে ৪ একর ১৭ শতাংশ জমি রেকর্ডের অভিযোগ
বগুড়া সদরের মালগ্রাম মৌজায় আরএস রেকর্ডের নতুন পর্চা প্রকাশের পর শত শত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আকবর আলী মণ্ডলের ছেলে আব্দুল হালিম মণ্ডলের নামে ৬০টি দাগে মোট ৪ একর ১৭ শতাংশ জমি রেকর্ড করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট জমির দলিলের অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
নন্দীগ্রাম উপজেলার কোশাস গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন ২০২২ সালের আগস্টে বগুড়া অঞ্চলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ চালুর দাবিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, চার দশক আগে জরিপ শুরু হলেও তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ভূমিসেবা আধুনিকায়নে মৌজাগুলোকে ডিজিটাল জরিপের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
একই দাবিতে বগুড়া সদরের মালগ্রাম এলাকার আব্দুল মতিনের ছেলে আব্দুল বাতেনও ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। তাঁর আবেদনে বলা হয়, গত চার দশকে জমির শ্রেণি ও বাস্তব অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যেসব জমি একসময় ফসলি জমি, পুকুর কিংবা গাছপালায় ঘেরা ছিল, সেখানে এখন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। ফলে পুরোনো নকশা ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অমিল তৈরি হয়েছে। বর্তমান অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে রেকর্ড তৈরি হলে সরকারও রাজস্ব হারাতে পারে বলে আবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
হাইকোর্টের আদেশের পরও জটিলতা
মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনের দায়ের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইনানুগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মালগ্রাম মৌজার প্রায় ৫৫ বিঘা জমিসংক্রান্ত একটি বাটোয়ারা মামলায় ডিক্রিপ্রাপ্তদের নামে রেকর্ড করা হয়নি। এ কারণে বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে ভুল রেকর্ড সংশোধনের জন্য ৪২ ধারায় দুই শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া মালগ্রাম মৌজার রেকর্ড সংশোধন নিয়ে হাইকোর্টে দুটি রিট মামলা চলমান রয়েছে।
অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, ভুল রেকর্ড গেজেট আকারে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হলে জমির মালিকদের আরও বেশি মামলা-মোকদ্দমায় জড়াতে হতে পারে। এতে জমি নিয়ে বিরোধ, সংঘাত ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ভুলের কথা স্বীকার করলেন জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা
বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোছা. রওনক জাহান আগের জরিপে ব্যাপক ভুলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা চুক্তিভিত্তিক কাজ করেছেন। যাঁদের তদারকির দায়িত্ব ছিল, তাঁরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করায় জরিপে অনিয়ম হয়েছে এবং ভুল রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
মালগ্রাম মৌজায় একজনের নামে ৬০টি দাগে ৪ একর ১৭ শতাংশ জমি রেকর্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, জরিপের সময় হয়তো জমির প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ কারণে পাশের জমির মালিকের নামে ওই জমিগুলো রেকর্ড হয়ে থাকতে পারে।
তবে ওই ব্যক্তির নামে এতগুলো দাগে জমি না থাকলেও কীভাবে এসব জমি তাঁর নামে রেকর্ড হলো, সে বিষয়ে সেটেলমেন্ট কার্যালয় থেকে তদন্ত করা হয়নি বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত মালিকেরা অভিযোগ দিলে তা যাচাই করে তাঁদের নামে জমি রেকর্ডের ব্যবস্থা করা হবে।
