প্রকাশিত : ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:২৬

রাজশাহীতে তেলের পাম্পে মোটরসাইকেল সিন্ডিকেটের থাবা

ফয়সাল আলম, রাজশাহী
রাজশাহীতে তেলের পাম্পে মোটরসাইকেল সিন্ডিকেটের থাবা

জ্বালানি তেলের সংকটকে পুঁজি করে রাজশাহী জেলা ও মহানগরীতে গড়ে উঠেছে চার শতাধিক সদস্যের একটি শক্তিশালী মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে পেট্রোল ও অকটেনের জন্য সাধারণ মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকেই তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। বাধ্য হয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছ থেকে দ্বিগুণ দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে তাদের।

জানা গেছে, রাজশাহী জেলা ও মহানগরীতে মোট ৪৪টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এসব পাম্প থেকে তেল সংগ্রহে সিন্ডিকেট সদস্যরা অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে। কখন কোন পাম্পে তেল সরবরাহ হবে, সে তথ্য আগে থেকেই সংগ্রহ করে তারা। তেল দেওয়ার আগের দিন থেকেই পাম্পের ভেতরে ১৫০ থেকে ২০০টি মোটরসাইকেল রেখে সিরিয়াল দখল করে নেয়। এতে সহযোগিতা করছেন পাম্পের কিছু নৈশ প্রহরী ও স্থানীয় যুবকরা।

অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ চালকরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল না পেলেও সিন্ডিকেটের সদস্যরা পাম্প কর্মচারীদের উৎকোচ দিয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ তেল নিচ্ছেন। পরে সেই তেল বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা একাধিক পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্পে রাত ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন থাকে। তবে এসব মোটরসাইকেলের মালিকদের অধিকাংশই সেখানে উপস্থিত থাকেন না। তারা মোটরসাইকেল রেখে বাসায় চলে যান। পাম্পের নৈশ প্রহরী ও স্থানীয় যুবকরাই এসব মোটরসাইকেল দেখাশোনা করেন।

শালবাগান এলাকার ইমাম হোসেন নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি পাম্পের ভেতরে তিনটি মোটরসাইকেল রেখে গেছেন এবং এ কাজে স্থানীয় যুবকদের সহায়তা পেয়েছেন। পাম্পের কর্মচারীরাও স্বীকার করেছেন, শতাধিক মোটরসাইকেল স্থানীয় যুবকরাই পাম্পে রেখে দেন।

তেল নিতে আসা আলমগীর কবির বলেন, “আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। প্রতিদিন প্রায় ১০০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালাতে হয়। রাত ২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি। বাধ্য হয়ে ২৫০ টাকা লিটার দামে পেট্রোল কিনতে হয়েছে।”

পবা উপজেলার নওহাটার রুচিতা ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন পাম্পে একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে পাম্পের ভেতরে শতাধিক মোটরসাইকেল রাখা হয় এবং প্রতি মোটরসাইকেলের জন্য নৈশ প্রহরীকে ৫০ টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, সিন্ডিকেট সদস্যরা প্রতিদিন একাধিক পাম্প থেকে ট্যাংক ভর্তি করে তেল সংগ্রহ করে বাইরে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা লিটার দামে বিক্রি করছেন।

রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলাতেও একই চিত্র বিরাজ করছে। তানোর, পুঠিয়া, বাগমারা ও গোদাগাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিন্ডিকেট সদস্যরা একই কৌশলে তেল সংগ্রহ করছেন।

বাগমারা সদরের নাজিম আলম জানান, "মোটরসাইকেলের তেল শেষ হয়ে গেলে তিনি স্থানীয় বাজার থেকে ৩০০ টাকা লিটার দামে পেট্রোল কিনতে বাধ্য হয়েছেন।"

স্কুল শিক্ষক জাফর ইকবাল বলেন,"তেল নেওয়ার জন্য প্রত্যেকটি পাম্পে আগেরদিন  রাত থেকে দীর্ঘ লাইন হচ্ছে। এতে করে একজন চাকুরিজীবীর পক্ষে এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই অচিরেই নগরীর সকল পাম্পে এ্যাপস ভিত্তিক তেল বিতরণ করা প্রয়োজন  অথবা চাকুরিজীবীদের জন্য আলাদা পাম্প বা সময় নির্ধারণ করে দেয়া উচিত।"

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি মনিমুল হক বলেন, “পাম্প মালিকরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়। কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কর্মচারী বা নৈশ প্রহরীরা সুবিধা নিতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।”

উপরে