প্রকাশিত : ১ জুলাই, ২০২৬ ০১:২৬

টেস্ট রিপোর্ট ছাড়াই কোটি টাকার রাস্তার কাজ? গঙ্গাচড়ায় এইচবিবি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ডিআরও-পিআইওর বক্তব্যে সাংঘর্ষিকতা

গঙ্গাচড়া, রংপুর সংবাদদাতাঃ
টেস্ট রিপোর্ট ছাড়াই কোটি টাকার রাস্তার কাজ? গঙ্গাচড়ায় এইচবিবি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ডিআরও-পিআইওর বক্তব্যে সাংঘর্ষিকতা

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন কোটি টাকার দুটি হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, পরিমাপে ঘাটতি এবং যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কাজ চালানোর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ইটের ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট ছাড়াই নির্মাণকাজ চলায় প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, বেতগাড়ী ইউনিয়নের বেতগাড়ী শাহপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে বানিয়াপাড়া পাকা মসজিদ পর্যন্ত এবং বড়বিল ইউনিয়নের উত্তর পানাপুকুর বিডিআরপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন এইচবিবি সড়কে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। উত্তর পানাপুকুর এলাকায় স্থানীয়দের বাধার মুখে একপর্যায়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক নির্মাণে একাধিক ইটভাটার নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, প্রকল্পে নির্ধারিত ৬ ইঞ্চি ভিটি বালুর পরিবর্তে মাত্র ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি বালু ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

প্রকল্পটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আওতায় এইচবিবি-ডব্লিউডি-৪১৩ প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। গঙ্গাচড়া উপজেলার তিনটি স্থানে মোট ১ হাজার ৫০০ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ২৮ হাজার ৬১৩ টাকা।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইকবাল ট্রেডার্স-এর স্বত্বাধিকারী মো. কামাল হোসেনের কাছে ব্যবহৃত ইটের ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে তাঁর কাছে কোনো টেস্ট রিপোর্ট নেই। পরে তা দেওয়া হবে। তবে বালুর পরিমাণ কম ব্যবহারের অভিযোগে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মিলন বলেন, “এ সময় এর চেয়ে ভালো ইট পাওয়া যায় না। আমরা যে ইট ব্যবহার করছি, সেটিই ভালো মানের।”

স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম কাল্টু, মফিজার রহমান, সাহেব আলী, জাহানুর রহমান ও জীবন হোসেন অভিযোগ করেন, নিম্নমানের ইট ও নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম ভিটি বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা দাবি করেন, বিষয়টি তদারকির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি রয়েছে। প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অভিযোগের পর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সজিবুল করিম ঘটনাস্থলে গিয়ে নিম্নমানের ইট সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে ব্যবহৃত ইটের ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইট পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট ছাড়াও আপাতত কাজ চলতে পারে।”

তবে এ বিষয়ে রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরও) গোলাম কিবরিয়ার বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, “ইটের টেস্ট রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ওই প্রকল্পে রাস্তার কাজ করা উচিত নয়।”

একই বিষয়ে দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, “রাস্তার কাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, প্রকল্পটির কাজ গত ১০ জুন ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো কাজ শেষ হয়নি। এতে নির্মাণকাজের মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

উপরে