প্রকাশিত : ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪৭

রংপুরে চারজনকে হত্যার পর শ্মশানে আশ্রয়, গার্ডের কাছে স্বীকারোক্তি

পুলিশের ধাওয়ায় পালিয়ে ৩ কিলোমিটার দূরের শ্মশানে যান মুগ্ধ
নিজস্ব প্রতিবেদক
রংপুরে চারজনকে হত্যার পর শ্মশানে আশ্রয়, গার্ডের কাছে স্বীকারোক্তি

 রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, আটকের দিন ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের একটি শ্মশানে আশ্রয় নেন মুগ্ধ দাস। সেখানে শ্মশানের গার্ড বিদ্যুৎ দাসের কাছে চারজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের কনফারেন্স রুমে মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, শ্মশানের গার্ড বিদ্যুৎ দাসের সঙ্গে পুলিশ কথা বলেছে। তিনিও আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ জানায়, রোববার ২৩ আগস্ট ভোরে মুগ্ধ দাসের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। পরে পুলিশ ধাওয়া করলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মাহিগঞ্জ-দখীগঞ্জ শ্মশানে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেখানে শ্মশানের গার্ড বিদ্যুৎ দাসের কাছে পানি ও আশ্রয় চান। এ সময় তিনি গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে হত্যার কথা জানান বলে পুলিশ দাবি করেছে।

জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ

হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তে পূর্বপুরুষদের জমি বিক্রি এবং এর অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে ক্ষোভের বিষয়টি উঠে এসেছে। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ওই জমি কিনেছিল বলে জানা গেছে। জমি বিক্রির অর্থ শরিকদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন না হওয়ায় কারও মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এ ছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে সামাজিক ও পারিবারিক দূরত্বের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানান তিনি।

পুলিশ কমিশনার বলেন, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর বাইরে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কোনো কারণ জড়িত থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে।

ইয়াবা সেবনের পর হত্যাকাণ্ড

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ইয়াবা সেবন করেছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা এক প্রতিবেশীর বাড়িতে ইয়াবা সেবনের পর আরও ইয়াবা সংগ্রহ করেন। পরে নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে যাওয়ার পর শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী সেখানে গেলে তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে ঘরে থাকা প্রিয়মকেও হত্যা করা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পুলিশের দাবি, বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকার সন্দেহে তারা বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করেন এবং কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থল থেকে খেজুরের বিচি, আগুনে পোড়ানোর আলামত ও ইয়াবা সেবনের উপকরণসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে।

দুজনের স্বীকারোক্তির দাবি পুলিশের

রোববার ২৩ আগস্ট ভোরে পুলিশ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করে। পরে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন। ওইদিন রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। ঘটনার পর তিনি একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাও নিয়েছিলেন। স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে তাকে আটক করা হয়। পরে মুগ্ধর বাড়িতে অভিযান চালালে তিনি পালিয়ে যান। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধাওয়া করে তুতফার্ম এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।

তিনি আরও বলেন, আলোচিত এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ব্যবহারকারী নয়, একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাটির তদন্ত করছে। ফরেনসিক ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

উপরে