প্রকাশিত : ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ১২:১৮

উত্তরায় চীনা নাগরিকদের টানা লাইভ ভিডিও, গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
উত্তরায় চীনা নাগরিকদের টানা লাইভ ভিডিও, গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ

রাজধানীর উত্তরায় একদল চীনা নাগরিককে মাসের পর মাস রাস্তাঘাট, অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় ঘুরে লাইভ ভিডিও ধারণ করতে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে থাকে দুটি মুঠোফোন। একটি দিয়ে ভিডিও ধারণ ও সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, অন্যটিতে চলে প্রয়োজনীয় কাজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁদের এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি বিরক্তি ও উদ্বেগ বাড়ছে।

উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর ও টেকপাড়া এলাকায় এসব ভিডিও ধারণের ঘটনা বেশি দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক বিভিন্ন অলিগলিতে এভাবে ভিডিও করেন। তবে তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা এবং ভিডিওর উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে কখনো কখনো এসব নাগরিক ব্যক্তিগত বাড়িঘরের ভেতরেও প্রবেশ করেন। এতে বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, ‘দু-এক দিনের ব্যাপার হলে হয়, কিন্তু এরা (চীনা নাগরিক) মাসের পর মাস এমন ভিডিও করে। আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগে তারা ভিডিও করা শুরু করে। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও দেখি তারা ভিডিও করে। কিন্তু ভিডিওগুলো কী করে, আমরা জানি না।’

ভিডিও প্রচারের উদ্দেশ্য কী

গত ২৭ অক্টোবর ও ৩ নভেম্বর উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ১৭ জন চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন প্রথম আলোর প্রতিবেদক। তবে অধিকাংশ চীনা নাগরিক কথা বলতে আগ্রহ দেখাননি। কেউ কেউ নিজেদের নাম ও দেশের পরিচয় দিয়ে চলে যান। ভাষাগত জটিলতার কারণে তাঁদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ সময় রিতু আক্তার নামে এক বাংলাদেশি নারীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, চীনা নাগরিকদের গাইড হিসেবে কাজ করেন এবং কয়েক মাস ধরে তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। তাঁর মতো আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নারীও তাঁদের সহায়তা করেন।

রিতুর সহযোগিতায় ফ্যাংইয়ো নামের এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে কথা হয়। ফ্যাংইয়ো জানান, পণ্যের প্রচারণার অংশ হিসেবে তাঁরা চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইচ্যাটে এসব লাইভ ভিডিও করেন। তবে উত্তরার এই এলাকা কেন বেছে নেওয়া হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও করার কারণ কী—এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি তিনি।

রিতু আক্তার জানান, চীনা নাগরিকেরা উইচ্যাট ও ডুয়িনসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিডিও প্রকাশ করেন। এসব ভিডিও থেকে তাঁরা আয় করেন বলে তাঁর দাবি। গাইড হিসেবে কাজের বিনিময়ে তিনি দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পান।

ভিডিওতে বাংলাদেশকে যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লাইভ ভিডিওতে চীনা নাগরিকেরা নিজেদের ভাষায় বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা দেন। তাঁদের কয়েকজনের বক্তব্য গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে অনুবাদ করে চীনা ভাষা জানা চারজন বাংলাদেশির সাহায্যে যাচাই করা হয়।

অনুবাদ করা বক্তব্যে দেখা যায়, উত্তরার বিভিন্ন স্থান থেকে ভিডিও করলেও কয়েকজন লাইভে নিজেদের ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন বলে পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ কেউ বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাপন, বাড়িঘর ও পরিবেশ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করছেন।

১ নভেম্বর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে খালপাড়ে দাঁড়িয়ে টেকপাড়ার দৃশ্য দেখাচ্ছিলেন মিয়ানমিয়ান নামের এক চীনা নারী। তিনি নিজেকে চীনের সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা বলে পরিচয় দেন। লাইভে তাঁকে এলাকাটিকে নয়াদিল্লি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং সেখানকার বাড়িঘর ও পরিবেশ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে শোনা যায়।

একই এলাকার একটি চায়ের দোকানে ভিডিও করছিলেন ওয়াং ওয়েই নামের আরেক চীনা নাগরিক। লাইভে তিনি চায়ের মান ও তৈরির পানি নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে লি ইয়াং নামের একজনকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ভবনে ব্যবহৃত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দেখিয়ে চীনা পণ্যের প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। অর্থাৎ সব ভিডিওতেই বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বক্তব্য ছিল না।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভিডিও ধারণের সময় কয়েকজন চীনা নাগরিক অনুমতি ছাড়াই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। এমনকি কখনো কখনো বাথরুমেও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেন।

রোজিনা খাতুন নামের এক বাসিন্দা বলেন, তাঁরা মাঝেমধ্যে ঘরের মধ্যে ঢুকে ভিডিও শুরু করেন। বাসার মধ্যে সব সময় জামাকাপড় ঠিকঠাক থাকে না। হঠাৎ কেউ ঢুকে ভিডিও করা শুরু করলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

আরেক বাসিন্দা পাপিয়া বেগম বলেন, ‘ভিডিও করতে করতে বাথরুমেও ঢুকে পড়ে অনেকে। তাদের কিছু বললেও বোঝে না। হাসে আর সরি বলে চলে যায়। সারা দিনই তাদের এমন কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। কেউ কোনো ব্যবস্থাও নেয় না।’

পুলিশের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয় বাসিন্দারা এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানালেও এ বিষয়ে পুলিশের কার্যকর নজরদারি আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খালিদ মনসুর বলেন, ‘তারা কেন ভিডিও করে, সেটা আসলে আমি জানি না। ভিডিওগুলো কোথায় পাবলিশ করে, সেটাও জানি না। তবে তারা যে ভিডিও করে, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি। এটা নিয়ে কাজ চলছে।’

উপরে