নওগাঁয় মন্দিরের অর্থ-সম্পদ তছরুপ, অভিযোগ মন্দির কমিটির সভাপতির | Daily Chandni Bazar নওগাঁয় মন্দিরের অর্থ-সম্পদ তছরুপ, অভিযোগ মন্দির কমিটির সভাপতির | Daily Chandni Bazar
logo
প্রকাশিত : ৪ জুলাই, ২০২৬ ১৭:৪৯
নওগাঁয় মন্দিরের অর্থ-সম্পদ তছরুপ, অভিযোগ মন্দির কমিটির সভাপতির
নিজস্ব প্রতিবেদক

নওগাঁয় মন্দিরের অর্থ-সম্পদ তছরুপ, অভিযোগ মন্দির কমিটির সভাপতির

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার পারইল গ্রামের শতবর্ষী শ্রীশ্রী চন্ডিমাতা ঠাকুরানী মন্দির ও শিব-কালী মন্দিরকে ঘিরে অর্থ আত্মসাৎ, দেবোত্তর সম্পত্তি দখল, জালিয়াতি, নথিপত্র ছিনতাই, অপহরণ ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি বিস্তারিত লিখিত আবেদন করেছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির বর্তমান সভাপতি সুভাষ চন্দ্র সরকার।
 
বুধবার (২৪ জুন) জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া ওই অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেন, ২০১২ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মন্দিরের বিভিন্ন আয় উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব জনসম্মুখে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিকল্পিতভাবে ওই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, মন্দিরের জমি ও পুকুর ইজারা, পূজা উপলক্ষে আয়োজিত মেলার দোকানিদের দেওয়া প্রণামী, বিভিন্ন দান ও অন্যান্য উৎস থেকে মোট ৪১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা আয় হয়। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত মেলা থেকে আরও ৫২ হাজার ৮০০ টাকা সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে ৪২ লাখ ১ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুবাশ চন্দ্র পাল, সাবেক সভাপতি তারিনী পদ সরকার ও সাবেক সভাপতি হরগোবিন্দ প্রামানিককে অভিযোগের মূল ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া নয়ন চন্দ্র সরকার, নয়ন চন্দ্র সন্যাসী, মিলন চন্দ্র প্রামানিক, শিরিন চন্দ্র প্রামানিক, সুজিত চন্দ্র প্রামানিক, রতন চন্দ্র প্রামানিক, হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (হিরো), পলাশ চন্দ্র পাল, সুব্রত কুমার প্রামানিক, অমেল চন্দ্র প্রামানিক, উজ্জল চন্দ্র প্রামানিক ও সুজিত চন্দ্র পালসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মন্দিরের অর্থ ও সম্পত্তি নিয়ে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
 
অভিযোগপত্রে বলা হয়, পারইল গ্রামের শ্রীশ্রী চন্ডিমাতা ঠাকুরানী মন্দির, শিব মন্দির ও কালী মন্দির এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু পুরোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। তৎকালীন জমিদার পরিবারের দান করা কয়েক একর দেবোত্তর সম্পত্তির ওপর এসব মন্দির প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে। অতীতে মন্দিরের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ জমি বিক্রি, বন্ধক ও জবরদখলের ঘটনা ঘটেছে। চন্ডিমাতা মন্দিরের প্রায় ৮ দশমিক ৪৫ একর সম্পত্তির একটি বড় অংশ বিভিন্ন সময়ে প্রতারণার মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। একইভাবে শিব ও কালী মন্দিরের নামে থাকা ৯৭ শতক দেবোত্তর সম্পত্তিও ব্যক্তিগত নামে রেকর্ড করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মন্দিরের সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমিগুলো ভোগদখল করেছেন এবং এ থেকে প্রাপ্ত অর্থেরও কোনো জবাবদিহি করেননি।
 
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, মন্দির পরিচালনা নিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে বিরোধ চলে আসছে। ২০০৫ সালে গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন কমিটি গঠিত হলেও পূর্ববর্তী কমিটিগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি।
 
সুভাষ চন্দ্র সরকার অভিযোগ করেন, ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা কমিটির নেতারা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হিসাব দেননি। হিসাব চাইতে গেলে সভায় উপস্থিত না হওয়া, নোটিশ গ্রহণে অস্বীকৃতি এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। পূর্বে এ বিষয়ে পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক এবং বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের কাছেও অভিযোগ করা হয়েছিল। সেই অভিযোগের পর কিছু সম্পত্তি উদ্ধার হলেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। মন্দিরের সম্পত্তি ও পরিচালনা নিয়ে বিরোধের জেরে একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
সুভাষ চন্দ্র সরকার দাবি করেন, ২০২৪ সালে মন্দিরের দেবোত্তর জমিতে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা হলে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বাধা দেন। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয় এবং আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। সুভাষ চন্দ্র সরকার বাদিয়ে মামলা করেন। আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা  দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গঠিত একটি নতুন কমিটিকে তিনি ‘অবৈধ কমিটি’ দাবি করে সেই কমিটির বিরুদ্ধে আদালতে পৃথক মামলা করেছেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, ৫ বছর মেয়াদী ২০২৪ সালের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অবৈধ ভাবে ২০২৬ সালে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
 
লিখিত অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশে বর্তমান কমিটির এক সদস্যকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অভিযোগ সূত্র বলছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সাধারণ সম্পাদক রতন চন্দ্র তরফদারকে অপহরণ করে সুব্রত প্রামানিকের মাছের হ্যাচারিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে আটকে রেখে কয়েকটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওই একই দিন দিবাগত রাতে সুভাষ চন্দ্র সরকারের বাড়িতেও সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তার দাবি, ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল বাড়িতে প্রবেশ করে তাকে হত্যার চেষ্টা করে। প্রাণভয়ে তিনি পালিয়ে যান। পরে দুষ্কৃতিকারীরা তার পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে মারপিট করে টাকা, স্বর্ণালংকার ও দামি জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং প্রাণনাশের আশঙ্কায় স্বাভাবিকভাবে বাড়িতে বসবাস করতে পারছেন না।
 
জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আত্মসাৎ হওয়া অর্থের হিসাব নিরীক্ষা, দেবোত্তর সম্পত্তি উদ্ধার, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মন্দির পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
 
স্থানীয়রা বলছেন, পারইল গ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চললেও সাম্প্রতিক সময়ে তা নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে।
 
মন্দির পরিচালনায়  যথাক্রমে সুভাষ চন্দ্র সরকার ও সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার তরফদার এর কমিটি বহাল থাকা অবস্থায় অবৈধ ভাবে  যথাক্রমে সভাপতি সুবাশ পাল ও সাধারণ সম্পাদক নয়ন কুমার সন্যাসী যোগসাজসে একটি কমিটি গঠন করে। এর পর সুভাষ চন্দ্র সরকার মোকাম নওগাঁর রাণীনগর সিভিল  জজ আদালতে সভাপতি সুবাশ পালের কমিটির সকল কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি চলমান আছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
 
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সভাপতি হরগোবিন্দ প্রামানিক বলেন, প্রতি বছরই হিসাব দেয়া হয়েছে। মন্দিরের জমি বিক্রির সাথে তিনি জড়িত নন। অনেক আগের কমিটির সদস্যরা দেবোত্তর জমি বিক্রি করেছে।
 
এদিকে সুব্রত প্রামানিক রতন চন্দ্র প্রামানিককে আটক রেখে ননজুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
 
এবিষয়ে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, দেবোত্তর সম্পত্তি আত্মসাতের সুযোগ নেই। অভিযোগটি ক্ষতিয়ে দেখার পর সত্যতা পেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থ্যা নেওয়া হবে।