আর মাত্র এক বছর পর অবসরে যাওয়ার কথা ছিল রনজিনা পারভীনের (৫৫)। কিন্তু তার আগেই রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইকারীদের টানে রিকশা থেকে পড়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারালেন তিনি। রনজিনা পারভীন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন।
চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকার ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে বাসে করে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন রনজিনা পারভীন।
শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকায় পৌঁছে রিকশায় করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন তিনি। পথে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে একটি মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা রিকশার পেছন থেকে তার ব্যাগ ধরে টান দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে রিকশা থেকে সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান রনজিনা পারভীন।
পরে তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিনা পারভীন স্বামী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বগুড়া শহরের পিটিআর মোড় এলাকায় বসবাস করতেন। তার স্বামী মতিউর রহমান মতিন ব্যবসায়ী।
রনজিনা পারভীনের ভাই জাহিদুল ইসলাম জানান, ১৯৯১ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন তার বোন। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর মাত্র এক বছর পর তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল।
তিনি জানান, চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে রনজিনা পারভীন ছিলেন দ্বিতীয়। তার মরদেহ এখনো বগুড়ায় পৌঁছায়নি। রাতে মরদেহ পৌঁছালে রোববার দুপুরে গাবতলী উপজেলার দাড়াইল পারিবারিক গোরস্তানে তাকে দাফন করা হবে।
স্বজনরা জানান, রনজিনা পারভীনের মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যরা গভীরভাবে শোকাহত। বিশেষ করে তার কিশোরী মেয়ে মাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছে।
বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ও রনজিনা পারভীনের দীর্ঘদিনের সহকর্মী রিজবোনা আক্তার বলেন, ‘২৬ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির দিনে আমরা ছয়জন শিক্ষিকা স্কুলে গিয়ে মিলাদ মাহফিলে অংশ নিই। পরে তার অনুরোধে সবাই তার মোবাইল ফোনে একটি গ্রুপ ছবি তুলি। তখন তিনি বলেছিলেন, শুক্রবার রাতে ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় যাবেন। এরপর সবাই যার যার মতো বাড়ি ফিরে যাই। মাঝে আর কোনো কথা হয়নি। কিন্তু আজ খবর পেলাম, তিনি আর নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি শুধু আমাদের প্রধান শিক্ষিকাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অভিভাবক, সহকর্মী ও একজন দক্ষ শিক্ষানুরাগী মানুষ।’
গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম বলেন, রনজিনা পারভীন অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষিকা ছিলেন। তার মতো শিক্ষক এই সময়ে পাওয়া দুষ্কর।
গাবতলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘আমার কাছে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। আমি জানতাম, তার পায়ে চোট লেগেছিল। সেখান থেকেই চোখে সমস্যা হচ্ছিল। এজন্য তিনি ঢাকায় চোখের চিকিৎসক দেখাতে গিয়েছিলেন। আজ এমন দুঃখজনক ঘটনা ঘটল।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত শোকাহত ও মর্মাহত। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তিনি সবার কাছে প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।’