শেরপুরে ৫৬ প্রাথমিকে নেই প্রধান শিক্ষক: সরকারি স্কুলে অনীহা, প্রাইভেটে ঝোঁক | Daily Chandni Bazar শেরপুরে ৫৬ প্রাথমিকে নেই প্রধান শিক্ষক: সরকারি স্কুলে অনীহা, প্রাইভেটে ঝোঁক | Daily Chandni Bazar
logo
প্রকাশিত : ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৫০
শেরপুরে ৫৬ প্রাথমিকে নেই প্রধান শিক্ষক: সরকারি স্কুলে অনীহা, প্রাইভেটে ঝোঁক
এনামুল হক, বগুড়াঃ

শেরপুরে ৫৬ প্রাথমিকে নেই প্রধান শিক্ষক: সরকারি স্কুলে অনীহা, প্রাইভেটে ঝোঁক

বিনা মূল্যে পড়াশোনা বই, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং তুলনামূলক ভালো অবকাঠামো থাকার পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বগুড়ার শেরপুরের অনেক শিক্ষার্থী। বাড়তি খরচ হলেও অভিভাবকেরা সন্তানকে ভর্তি করছেন কিন্ডারগার্টেনে। এর পেছনে তাঁরা বলছেন, সরকারি বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান, ইংরেজি শিক্ষা, শিক্ষার্থীর প্রতি ব্যক্তিগত নজরদারি জবাবদিহিতার ঘাটতির কথা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রধান শিক্ষকসংকট। উপজেলার ৫৬টি স্কুলেই নেই প্রধান শিক্ষক।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানায়, উপজেলায় ১৩৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৬টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে পদগুলো শূন্য থাকায় সহকারী শিক্ষকদেরই প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

আরও জানা যায়, ২০১২ ২০১৮ সালে কিছু প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। ফলে একের পর এক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন শুধু বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগকে তাঁরা যথেষ্ট মনে করছেন না। সন্তান নিয়মিত পড়ছে কি না, পরীক্ষায় কেমন করছে, কোন বিষয়ে দুর্বল এবং শিক্ষক তার অগ্রগতির খোঁজ রাখছেন কি না, এসব বিষয়ও তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষক অবকাঠামো থাকলেও সব বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা স্কুলে গেলেও তারা কতটা শিখছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে।

এই দুর্বলতার চিত্র দেখা যায় গত ২১ জুলাই জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের আকস্মিক পরিদর্শনেও। উপজেলার গাড়ীদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় তিনি পঞ্চম শ্রেণির বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ইংরেজি বই পড়তে দেন। তাঁদের অনেকেই ঠিকভাবে রিডিং করতে পারেনি। পরে জেলা প্রশাসক শিক্ষকদের মানসম্মত পাঠদানের বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দেন।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতায় দুর্বলতা তুলনামূলক বেশি।

শেরপুরের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক বছরে কিন্ডারগার্টেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো সামগ্রিক শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এসব প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে।

এডুকেয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (ইংলিশ ভার্সন)-এর পরিচালক সুমন আরবি বলেন, কিন্ডারগার্টেনগুলোতে আন্তরিকতা দায়িত্ব নিয়ে পড়ানোর কারণে অভিভাবকদের কাছে এগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। শিক্ষার্থী তুলনামূলক কম থাকায় প্রতিটি শিশুর প্রতি আলাদা নজর দেওয়া সম্ভব হয়। নিয়মিত পরীক্ষা, বাড়ির কাজ, পড়াশোনার কড়াকড়ি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগও বেশি থাকে।

শিক্ষক আব্দুর রশিদ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেনে শুরু থেকেই ইংরেজি, স্পোকেন ইংলিশ উচ্চারণের ওপর জোর দেওয়া হয়। কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম অনুসরণের কথাও প্রচার করে। এসব কারণে অভিভাবকদের একটি অংশ কিন্ডারগার্টেনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

আরেক শিক্ষক ফারুক আহমেদ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শ্রেণিকক্ষে ৫০ থেকে ৭০ জন, কখনো তারও বেশি শিক্ষার্থী থাকে। এত শিক্ষার্থীকে একজন শিক্ষকের পক্ষে সমানভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রত্যেকের প্রতি আলাদা নজর দেওয়া কঠিন। কিন্ডারগার্টেনে একটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থী কম থাকায় শিক্ষকেরা তুলনামূলকভাবে প্রতিটি শিশুর পড়াশোনার খোঁজ রাখতে পারেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলো পূরণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুতই সংকটের সমাধান হবে। বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান উন্নয়নে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রেজোয়ান হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় শূন্য পদগুলো পূরণে খুব দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান, তদারকি জবাবদিহিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে না। তবে নিবন্ধন না নিলে সরকারি বই অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে না।