অভাব জয় করে শাবিপ্রবিতে মনিরার স্বপ্নযাত্রা, সড়কে থেমে গেল জীবন | Daily Chandni Bazar অভাব জয় করে শাবিপ্রবিতে মনিরার স্বপ্নযাত্রা, সড়কে থেমে গেল জীবন | Daily Chandni Bazar
logo
প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:৫০
অভাব জয় করে শাবিপ্রবিতে মনিরার স্বপ্নযাত্রা, সড়কে থেমে গেল জীবন
বীরগঞ্জ, দিনাজপুর সংবাদদাতাঃ

অভাব জয় করে শাবিপ্রবিতে মনিরার স্বপ্নযাত্রা, সড়কে থেমে গেল জীবন

দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার বিজয়পুর গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী মনিরা আক্তার। পরিবারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও পরিশ্রমের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মনিরা। তাঁর অকালমৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

নিহত মনিরা আক্তার বীরগঞ্জ উপজেলার ৮ নং ভোগনগর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের বিজয়পুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মকবুল ইসলাম ও মোছা. রুখসানা বেগম দম্পতির মেয়ে। দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র মেয়ে। তাঁর ভাইয়ের নাম মো. আরাফাত ইসলাম।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি কাটাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বাড়িতে এসেছিলেন মনিরা। ছুটি শেষে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার বেড়তলা এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বাস ও কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাঁকে ঢাকায় বাংলাদেশ মাল্টিকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

মনিরার শিক্ষাজীবন ছিল সাফল্য ও অধ্যবসায়ের পরিচায়ক। তিনি বীরগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ পান।

অসচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও নিজের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ অর্জন করেছিলেন মনিরা। উচ্চশিক্ষা শেষ করে স্বাবলম্বী হওয়া, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘব করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। মেয়ের সাফল্যের মধ্য দিয়ে পরিবারের অভাব দূর হবে, জীবনে স্বস্তি ফিরবে, এমন আশায় দিন কাটছিল তাঁর বাবা-মায়ের।

সংসারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি মকবুল ইসলাম ও রুখসানা বেগম। নিজেদের নানা কষ্টের মধ্যেও তাঁরা মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁদের আশা ছিল, মনিরা একদিন উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে প্রতিষ্ঠিত হবেন এবং পরিবারের দায়িত্ব নেবেন।

কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সেই স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছে। যে মেয়েকে ঘিরে একটি পরিবার নতুন করে আশার আলো দেখেছিল, তাঁর অকালপ্রয়াণে সেই পরিবারকে এখন বহন করতে হচ্ছে অপূরণীয় ক্ষতির ভার।

মনিরার মৃত্যুর খবরে তাঁর পরিবার ও স্বজনদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সহপাঠীদের মধ্যেও শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়া এই তরুণীর মৃত্যু তাঁর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের করুণ সমাপ্তি ঘটিয়েছে।

মনিরার জীবনসংগ্রাম অভাবের মধ্যেও সন্তানকে শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখা অসংখ্য পরিবারের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে দেয়নি, সড়ক দুর্ঘটনায় একজন তরুণ শিক্ষার্থীর প্রাণহানির বেদনাও সামনে এনেছে।

উচ্চশিক্ষা শেষ করে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর যে স্বপ্ন নিয়ে মনিরা এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তা আর পূরণ হলো না। বিজয়পুর গ্রামের এই মেধাবী শিক্ষার্থীর অকালমৃত্যুতে তাঁর পরিবার ও স্বজনদের জীবনে তৈরি হয়েছে গভীর শূন্যতা।