প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ১১:১৭

এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন, পদত্যাগের পেছনে জানালেন চার কারণ

চাঁদনী ডিজিটাল ডেস্ক রিপোর্টঃ
এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন, পদত্যাগের পেছনে জানালেন চার কারণ

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এর পেছনে চারটি কারণ তুলে ধরেছেন তিনি। কারণগুলো হলো—জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠন, বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া, নারী নেতৃত্বের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং কাউন্সিল ছাড়াই নতুন কমিটি গঠন।

ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন জানান, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয়। দলটির সঙ্গে জোট করলে এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে বড় মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।

তিনি লেখেন, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে দলের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। তবে তাঁর দাবি, এনসিপি প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধ থেকে সরে যাওয়ায় দলটির ভেতরে মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আর সুযোগ দেখছেন না তিনি।

জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি

পদত্যাগের প্রথম কারণ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোটকে উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর অভিযোগ, এনসিপির রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। সংবিধান, আইন-কানুন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের যে লক্ষ্য নিয়ে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, জামায়াত সেই সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না।

সামান্তার ভাষ্য, জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, দলটির সঙ্গে জোটের কারণে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হচ্ছে এবং উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বড় দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারত।

সামান্তার অভিযোগ, এনসিপির সামনে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অথবা পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়—এমন দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ ছিল। কিন্তু দলটি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

তিনি আরও দাবি করেন, নির্বাচনি জয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, এ ধরনের জোটের কারণে সংস্কারবিহীন ব্যবস্থার নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি জানানোর নৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়েছে।

নারী নেতৃত্বের মর্যাদা নিশ্চিত না করা

তৃতীয় কারণ হিসেবে এনসিপিতে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত না করার অভিযোগ তুলেছেন সামান্তা শারমিন।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারিতে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আন্দোলনে তাঁদের অংশগ্রহণের অন্যতম ভিত্তি ছিল রাজনৈতিক অধিকার, সমান মর্যাদা এবং বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর নারীদের সেই ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ।

সামান্তার মতে, শুধু দলে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; নেতৃত্ব, সাংগঠনিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, এনসিপি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি; বরং রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে আপস করেছে।

কাউন্সিল ছাড়াই নতুন কমিটি গঠন

চতুর্থ কারণ হিসেবে কাউন্সিল ছাড়াই এনসিপির নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন তিনি।

সামান্তার মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্বের জবাবদিহি ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। কিন্তু কাউন্সিল না করে আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন না করলে নেতৃত্বের বৈধতা, প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। যে দল নিজের ভেতরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য—তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বিভাজনের বদলে ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান

পদত্যাগের ঘোষণায় সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপিকে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক লক্ষ্য পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েও কোনো পরিবর্তনের আগ্রহ দেখেননি তিনি। এ কারণে দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে ঐক্যের রাজনীতি। ভিন্নমত, বিশ্বাস ও পরিচয়ের মানুষকে অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে—এমন নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ গড়ে তোলা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, নতুন রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি হতে হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ, জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। পররাষ্ট্রনীতিও নির্ধারিত হওয়া উচিত বাংলাদেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে।

সামান্তার ভাষ্য, তরুণদের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন নয়; বরং এমন রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজন রাজনীতির চালিকাশক্তি হবে না। তিনি এ ধরনের রাজনৈতিক উদ্যোগে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন।

উল্লেখ্য, গত ২৩ অক্টোবর এনসিপি ঘোষিত নতুন কমিটিতে সামান্তা শারমিনকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পদাবনতি হয়েছে বলে আলোচনা তৈরি হয়েছিল।

উপরে